শ্রোতা অত:পর চিলিন শ্রিফান্ বিশ্ববিদ্যালয়
তাপস বিশ্বাস
তাপস বিশ্বাস
আমি তাপস বিশ্বাস। আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র ইন্টারমিডিয়েট। বর্তমানে চীনের চিলিন প্রদেশের চিলিন শ্রিফান্ বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষার ওপর লেখা-পড়া করছি। আমার Background on study হলো- আমি শিশু শ্রেণীতে পড়াশোনাকালীন সময়ে আমার মা আমাকে একটি শিশু শ্রেণীর বই কিনে দেন। বইটিতে চীন দেশের শিশু নামে একটি গল্প এবং চীনা শিশুদের কয়েকটি সুন্দর ছবি ছিল। মা বলতেন, দেখ তাপস চীনা শিশুরা কত সুন্দর! তুমি যদি ভাল করে লেখাপড়া কর তাহলে তাদের মতো হতে পারবে। তখন থেকেই চীন দেশ ও চীনা শিশুদের প্রতি আমার আগ্রহ জাগে এবং আকর্ষণ বাড়তে থাকে। কিন্তু আমি ছাত্র অবস্থায় লেখাপড়ায় তেমন একটা ভাল ছিলাম না। একেক শ্রেণীতে সাধারণভাবে পাস করে পরবর্তী শ্রেণীতে ভর্তি হই। অষ্টম শ্রেণীতে ‘চৈনিক সভ্যতা এক পরম বিষ্ময়' নবম শ্রেণীতে ‘মহাচীনে কয়েকদিন' নামক প্রবন্ধ দুটি পড়ার পর আমাকে চরমভাবে চীনের প্রতি আকর্ষণ করে। তখন চীনের সাথে আমার কোনই যোগাযোগ নেই। বন্ধু বান্ধবও নেই। কিন' চীনা সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে দেখতে আমার ই"ছা করে। আমি সবেমাত্র একজন নবম শ্রেণীর ছাত্র। চীনে আসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও নেই। সুতরাং চীনে আসা খুবই কঠিন। এদিকে অষ্টম শ্রেণীতে পরীক্ষায় একবছর অকৃতকার্য হই এবং দশম শ্রেণীতে টেস্ট পরীক্ষায় পর পর দুবার অকৃতকার্য হই। শেষে এই বিদ্যালয় ছেড়ে অন্য উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। লেখাপড়ায়ও মন বসে না, কী করব? একটি রেডিও সেট নিয়ে মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়াই আর ছায়াছবির গান শুনি। এভাবেই দিন কাটতে থাকে। একদিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে রেডিও সেটের টানিং ঘুরাতেই শিশুদের কন্ঠের মত শ্র"তিমধুর বাংলা কথাবার্তা শুনতে পাই, তখন আমি সাথে সাথেই রেডিও সেটটির স্টেশন ভাল করে সনাক্ত করি। পরদিন একই সময়ে আমি আবার ঐ স্টেশনে যাই এবং শুনতে পাই সিআরআইয়ের বাংলা অনুষ্ঠান। এরপর থেকে প্রতিদিন অনুষ্ঠান শুনতে থাকি। অনুষ্ঠান খুব ভালো লাগে। ৫/৬দিন পর অনুষ্ঠান থেকে ঠিকানা সংগ্রহ করি এবং চীনে চিঠি পাঠাই। প্রায় একমাস পর চীন থেকে আমার কাছে প্রথম চিঠি আসে, তখন আনন্দে আমি আত্মহারা। মনে মনে শুধু ভাবি সুদূর চীন দেশ থেকে আমার কাছে চিঠি এসেছে। এরপর থেকে সিআরআইয়ের সাথে আমার যোগাযোগ চলতে থাকে। সিআরআই আয়োজিত বেশ কয়েকটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দু/একবার পুরস্কার পেয়েছি। চীনের একশ বছর শিরোনামে ২০০১ সালে সিআরআইয়ের বাংলা বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত জ্ঞানযাচাই প্রতিযোগিতায় পুরস্কার নিতে এসে চীনা দূতাবাসে উত্তরণ সিআরআই লিস্নার্স ক্লাবের প্রেসিডেন্ট মি. মঞ্জুর"ল আলম রিপন ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। তিনি আমার স্ন্যাফও নিয়েছেন। ২০০১ সালে এইচএসসি পাস করার পর ব্রাক্ষণবাড়িয়া সরকারি কলেজে মেনেজমেন্টের ওপর অনার্সে ভর্তি, তৃতীয় বর্ষে ফাইনাল পরীক্ষায় অকৃতকার্য হই। এদিকে পূর্ববর্তী পরীক্ষার ফলাফলও ভাল নয়। কোন রকমমাত্র ৩য় বিভাগ। কী করব এই সার্টিফিকেট দিয়ে? অপরদিকে আমার ক্লাসমেটরা ভাল ভাল রেজাল্ট নিয়ে বহুদূর পৌঁছে গেছে। তাদের কাছে যেতেও আমি লজ্জ্বা বোধ করি। একদিন সিআরআইয়ের বাংলা বিভাগের চীনা ভাষা শেখার আসরে চীনা ভাষা শেখার গুর"ত্ব শুনতে পাই। তখন চীনা ভাষা শেখার জন্য ব্যাপক প্রচেষ্টা চালাই। কিন্তু ভাষা শেখা খুবই কঠিন। কিভাবে শিখব? রেডিও অনুষ্ঠানে প্রচারিত দুএকটি বাক্য আর শব্দ দিয়ে চীনা ভাষা শেখা অত্যন- দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার।
২০০৫ সালের ১ জুলাই প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক ভাষা ইনষ্টিটিউটে এক বছর মেয়াদি চীনা ভাষার জুনিয়র কোর্সে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি পাই। এই বিজ্ঞপ্তি অনুসারে আমি চীনা ভাষার ভর্তি পরীক্ষার ফর্ম সংগ্রহ করি এবং ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এই কোর্সে ভর্তি হই। ৩/৪ মাস ক্লাস করার পর একদিন স্যার বললেন- চীনা ভাষা যারা ভাল করবে চীন সরকার তাদেরকে স্কলারশীপ দেবে। এরপর চীনা ভাষা গভীর মনোযোগের সাথে শিখতে শুর" করি। ২০০৭ সালের ফেব্র"য়ারি মাসে চীনা দূতাবাস কর্তৃক আয়োজিত স্কলারশীপ লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। উল্লেখ্য এই পরীক্ষায় বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে ৯০০-রও বেশি প্রতিযোগী অংশ নিয়েছিল। এমন কী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর শিক্ষক/ প্রফেসর পর্যন্ত। এদের মধ্যে থেকে আমরা দশজন স্কলারশীপের আওতায় আসি। আমার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ২০০৭ সালের ৩০ আগস্ট আমি চীনে আসি। চীনের চিলিন প্রদেশের চিলিন শ্রিফান্ বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষার ওপর লেখাপড়া করছি। এখানে আমার দু'বছর স্কলারশীপ পড়াশোনা শেষে দু'বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরবর্তী কোর্স সম্পন্ন করব। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমেরিকা, নরওয়ে, থাইল্যান্ড, কানাডা, লাওস, ডেনমার্ক, প্যারাগুয়ে প্রভৃতি দশটি দেশের ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করছে। এবছর আমি বাংলাদেশ থেকে এবং লাওস থেকে দু'জন স্কলারশীপ নিয়ে এখানে পড়তে এসেছি। আর বাকিরা সবাই নিজ খরচে পড়তে এসেছে। চুপিং-এ একমাস লেখাপড়ার খরচ, থাকা খাওয়া সহ আনুমানিক ২০০০ ইউয়ান।
৪ঠা এপ্রিল ২০০১ সন্ধ্যা ৬ টায় চীনা দূতাবাসের মিলনায়তনে মিলিত
হওয়া শ্রোতাদের মাঝখানে তাপস বিশ্বাস
কিন্তু বেইজিং-এ ৪০০০ ইউয়ানেরও বেশি। এখানে বিদেশি ছাত্র-ছাত্রীদের থাকার জন্য রয়েছে আধুনিক বিল্ডিং এবং স্পেশাল নিরাপত্তা। রাজধানী বেইজিং থেকে চুপিং-এর দূরত্ব ১৫০০ কিমি-রও বেশি। চুপিং শহরের চারদিকে রয়েছে অভাবনীয় সুন্দর ও আকষর্ণীয় সবুজ প্রকৃতি। এই সুদৃশ্য সবুজ প্রকৃতির মাঝে চীনারা নির্মাণ করেছে সুরম্য অট্টালিকা, যা না দেখলে কল্পনা করা যাবে না। এখানে আছে সুদৃশ্য কয়েকটি হৃদ যা পর্যটকদের ব্যাপকভাবে আকর্ষণ করে। এককথায় চীনে আসলে বাংলাদেশের দর্শনীয় স্থানগুলোর কথা মনে পড়বে না। চৈনিক সভ্যতার এই দেশে মানুষ খুবই শান্ত প্রিয়। সবাইকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানাই। আমার মোবাইল নম্বর: ০০৮৬৪৩৪৩২৯৬৫৭০।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন